উন্নয়নের নামে অন্নদাতার থালায় বালু! - দৈনিক দেশ কন্ঠ

উন্নয়নের নামে অন্নদাতার থালায় বালু!

প্রকাশকঃ দৈনিক দেশ কন্ঠ
প্রকাশ: অক্টোবর ১৯, ২০২৬

​মনর উদ্দিন মনির : “কৃষিই আমাদের প্রাণ, কৃষকই আমাদের বাঁচিয়ে রাখে”—রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ কিংবা সরকারি নীতিমালায় এই বুলি আমরা প্রতিনিয়ত শুনি। কিন্তু বাস্তবতার চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। লাখাই উপজেলার সুতাং নদী অংশ পুনঃখনন প্রকল্পের বালু ও মাটি ফেলার কারণে ঢেকে যাচ্ছে উপজেলার শত বিঘা উর্বর তিন ফসলি জমি। নদী বাঁচানোর এই উদ্যোগে স্থানীয় কৃষকদের সোনালী স্বপ্ন এখন বালিচাপা পড়েছে।

​জানা গেছে, সুতাং নদী পুনরুজ্জীবিতকরণ ও দূষণমুক্তকরণ প্রকল্পের আওতায় সম্প্রতি নদী পুনঃখনন কাজ শুরু হয়েছে। ৪৭ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে এই মেগা প্রকল্পের। তবে লাখাই অংশের নির্দিষ্ট বরাদ্দ নিয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেনি জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।

​এদিকে নদী থেকে উত্তোলিত বালু ও পলি ফেলা হচ্ছে নদীর তীর ঘেঁষে থাকা লাখাই, স্বজনগ্রাম, শিবপুর, নোওয়াগাঁও, বামৈ, ভাদিকারা, বুল্লা সহ বিভিন্ন গ্রামের শতাধিক বিঘা উর্বর কৃষি জমিতে। ফলে আসন্ন আমন ও বোরো মৌসুমে ধান উৎপাদন হওয়া নিয়েও ঘোর অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, উপজেলা কৃষি অধিদপ্তর এখনো পর্যন্ত ঠিক কী পরিমাণ জমি বালু ভরাট হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান জানাতে পারেনি।

​কৃষিবিদ ও অভিজ্ঞ কৃষকদের মতে, নদীর তলদেশের মোটা বালু কিংবা অনুর্বর পলিমাটি যখন ফসলি জমির ওপর ২ থেকে ৫ ফুট উঁচু করে স্তূপ করা হয়, তখন জমির উর্বরতা একনিমেষে ধ্বংস হয়ে যায়। এই বালু সরিয়ে ফেললেও বহু বছর সেখানে আর আগের মতো ফলন হয় না। এক মৌসুম জমি অনাবাদী থাকা মানে কেবল কৃষকের পকেট খালি হওয়া নয়, বরং তা সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তার ওপর বড় এক আঘাত।

​সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, কৃষকদের কান্নার রোল। বহু কৃষক জমি লিজ নিয়ে কিংবা চড়া সুদে ঋণ নিয়ে এবার ধান চাষের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তাদের চোখের সামনেই আজ সোনালী স্বপ্নের ওপর বালুর স্তূপ। স্থানীয় প্রশাসনের অদূরদর্শিতা, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের গাফিলতি এবং চরম জবাবদিহিতার অভাবে নদী রক্ষা করতে গিয়ে নিঃস্ব করা হচ্ছে অন্নদাতা কৃষকদের।

​মাটি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্তোলিত বালু ফেলার জন্য নির্দিষ্ট খাস জমি, নিচু অনুর্বর এলাকা কিংবা সরকারি ডাম্পিং জোন ব্যবহার করাই আইনি নিয়ম। কিন্তু পরিবহন খরচ বাঁচাতে ও সহজ উপায়ে কাজ সারতে ঠিকাদাররা নদীসংলগ্ন উর্বর ধানক্ষেতেই বালু ফেলছে।

​বিশ্বজুড়ে খাদ্য সংকটের এই সময়ে প্রতি ইঞ্চি জমি চাষের আওতায় আনার নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও সরকারি প্রকল্পে এভাবে কৃষি জমি ধ্বংস করাকে চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতা বলছেন সচেতন মহল।

অবিলম্বে কৃষি জমিতে বালু ফেলা বন্ধ করতে হবে এবং চলমান কাজের তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। আর যেসব জমিতে ইতিমধ্যে বালু ফেলা হয়েছে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বা সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে নিজ খরচে তা অপসারণ করে জমি পুনরায় চাষযোগ্য করতে হবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। ভবিষ্যতে নদী খননের বালু কৃষি জমি নষ্ট না করে রাস্তাঘাট নির্মাণ বা ইটভাটায় ব্যবহারের মতো টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

​নদী ও কৃষি—দুটিই আমাদের জীবনের মূল চালিকাশক্তি। একটিকে বাঁচাতে গিয়ে অন্যটিকে বলি দেওয়া কখনোই টেকসই উন্নয়ন হতে পারে না। কৃষকের চোখে জল আর পেটে ক্ষুধা রেখে কিসের এই উন্নয়ন?—নীতিনির্ধারকদের কাছে এখন এটাই সাধারণ মানুষের বড় প্রশ্ন।