
মো:আল-মাহফুজ শাওন ঃ
রাজনৈতিক কোন্দল, আধিপত্য বিস্তারের লড়াই, চাঁদাবাজির নিয়ন্ত্রণ এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সংঘর্ষকে কেন্দ্র করে সারা দেশে খুন, টার্গেট কিলিং ও অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। ফলে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা এখন হামলা ও হত্যাকাণ্ডের প্রধান টার্গেটে পরিণত হচ্ছেন বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চ, এপ্রিল ও মে—এই তিন মাসে সারা দেশে **৯১৫টি হত্যাকাণ্ডের মামলা** হয়েছে। অর্থাৎ, প্রতিদিন গড়ে **১০টিরও বেশি খুনের ঘটনা** ঘটেছে। এর মধ্যে মার্চে ৩১৭টি, এপ্রিলে ২৮৮টি এবং মে মাসে ৩১০টি হত্যামামলা দায়ের হয়েছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৪ সালের একই সময়ে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা ছিল ৭৯৪টি। যদিও গত বছরের একই সময়ে ৯৯৩টি মামলা হয়েছিল, তবে এর মধ্যে ২২৬টি ছিল আগের ঘটনার জের ধরে দায়ের হওয়া মামলা। ফলে প্রকৃত হিসেবে চলতি বছরের হত্যাকাণ্ডের হার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
## অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ অভিযান
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গত ১ মে থেকে দেশজুড়ে অবৈধ অস্ত্রবিরোধী বিশেষ অভিযান শুরু করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। অভিযানের অংশ হিসেবে গতকাল পর্যন্ত **১৫৩টি অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র** উদ্ধার করা হয়েছে। এছাড়া উদ্ধার করা হয়েছে **১ হাজার ৭৮৫ রাউন্ড গুলি ও কার্তুজ, ৫২টি ম্যাগাজিন, ৩২টি হাতবোমা এবং ২ হাজার ২০০ কেজি গানপাউডার।**
## কোথায় কত হত্যাকাণ্ড
তিন মাসের পরিসংখ্যানে সবচেয়ে বেশি **২০৭টি হত্যাকাণ্ড** ঘটেছে ঢাকা রেঞ্জে। এরপর রয়েছে—
– চট্টগ্রাম রেঞ্জে ১৮৬টি
– রাজশাহী রেঞ্জে ১০৬টি
– খুলনা রেঞ্জে ৮৪টি
মেট্রোপলিটন এলাকাগুলোর মধ্যে ঢাকায় সবচেয়ে বেশি **৫৭টি হত্যাকাণ্ড** সংঘটিত হয়েছে।
## চট্টগ্রামে বাড়ছে টার্গেট কিলিং
রাজধানীর পর সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে চট্টগ্রামে। গত ১৩ জুন রাউজান উপজেলার একটি ব্যস্ত বাজারে যুবদল নেতা **মাসুদুল হক চৌধুরী**কে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, একটি অটোরিকশায় করে আসা ৫ থেকে ৭ জন সশস্ত্র ব্যক্তি খুব কাছ থেকে তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে পালিয়ে যায়।
এর আগে ৫ জানুয়ারি একই উপজেলার পূর্ব গুজরা ইউনিয়নে নিজ বাড়ির সামনে যুবদল নেতা **জানে আলম সিকদার**কে গুলি করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। একের পর এক হত্যাকাণ্ডে স্থানীয়দের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে এবং অনেকেই রাউজানকে এখন ‘সন্ত্রাসের জনপদ’ হিসেবে উল্লেখ করছেন।
## লুট হওয়া অস্ত্রের বড় অংশ এখনো উদ্ধার হয়নি
২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর চট্টগ্রামের বিভিন্ন থানা ও ফাঁড়ি থেকে **৯৪৫টি আগ্নেয়াস্ত্র লুট** হয়েছিল। এর মধ্যে প্রায় ৭০০টি অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে এবং নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে ৬১৭টি অস্ত্র জমা পড়েছিল। তবুও এখনো প্রায় **১৬৫টি অস্ত্রের হদিস মেলেনি**, যা নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে রয়েছে।
## খুলনাসহ বিভিন্ন জেলায় সহিংসতা
গত ১৩ জুন খুলনায় এক বিএনপি কর্মীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এছাড়া ১৫ জুন খুলনা শহরের দৌলতপুর এলাকায় ফজরের নামাজের সময় একটি মসজিদের ভেতরে সন্ত্রাসীরা গুলি চালালে দুই মুসল্লি আহত হন।
একই দিনে ঢাকার পশ্চিম রামপুরায় শীর্ষ সন্ত্রাসী **ইয়াসিন খান ওরফে ‘কাইল্যা পলাশ’** গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হন। কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার মাত্র এক মাসের মাথায় তার ওপর এই হামলার ঘটনা ঘটে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর জামিনে মুক্তি পাওয়া কিংবা বিদেশ থেকে ফিরে আসা কয়েকজন কুখ্যাত অপরাধী ও গ্যাং লিডার নিজেদের হারানো নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। এর ফলে সংঘর্ষ ও সহিংসতার মাত্রা বেড়েছে।
## রাজনৈতিক সহিংসতার চিত্র
মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)-এর তথ্য অনুযায়ী—
– মে মাসে ৬৪টি রাজনৈতিক সহিংসতায় ৫ জন নিহত ও ২৮৯ জন আহত হয়েছেন।
– এপ্রিলে ৯৮টি ঘটনায় ৬ জন নিহত ও ৫৩৩ জন আহত হয়েছেন।
– মার্চে ১১৩টি ঘটনায় ১৮ জন নিহত ও ৯১২ জন আহত হয়েছেন।
এই সময়ে চট্টগ্রামের রাউজানে বিএনপি কর্মী নাসির উদ্দিন, বিএনপি নেতা কাউসারুজ্জামান, পাবনার ছাত্রদল নেতা ইমরান হোসেন, খুলনার শ্রমিক দল নেতা মাসুম বিল্লাহ এবং বাগেরহাটের শ্রমিক লীগ নেতা শেখ সোহেল হত্যার শিকার হন।
## সীমান্ত দিয়ে বাড়ছে অস্ত্র চোরাচালান
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য বলছে, সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার করে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা বেশি ঘটছে। গত দেড় বছরে শুধু যশোর সীমান্ত এলাকাতেই **৬২টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা** ঘটেছে, যার অধিকাংশে বিদেশি পিস্তল ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, তুরস্ক ও জার্মানিতে তৈরি উন্নতমানের পিস্তল ও রিভলবার। এছাড়া একটি অত্যাধুনিক স্বয়ংক্রিয় একে-২২ ক্যালিবার রাইফেলও উদ্ধার করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, পার্বত্য চট্টগ্রামের পর যশোর সীমান্ত এখন অবৈধ ক্ষুদ্র অস্ত্র প্রবেশের অন্যতম প্রধান রুট। প্রতিবেশী দেশে তৈরি কাটা রাইফেল, বেলঘরিয়া পিস্তল এবং ৯ এমএম পিস্তল সহজে বহন ও গোপন করা যায় বলে চোরাচালানকারীরা এগুলো বেশি ব্যবহার করছে।
## মোহাম্মদপুরেও থামছে না অপরাধ
রাজধানীর মোহাম্মদপুর এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত অভিযান চললেও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আসছে না। সর্বশেষ দুই দিন আগে র্যাবের অভিযানে বিদেশি অস্ত্রসহ **সোহেল ওরফে ‘মাওরা সোহেল’** নামে পরিচিত এক শীর্ষ ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
র্যাব জানিয়েছে, তার বিরুদ্ধে ছিনতাই, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ও অবৈধ অস্ত্র ব্যবহারের একাধিক অভিযোগ রয়েছে। অভিযানের সময় তার কাছ থেকে একটি বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়।
### উদ্বেগ বাড়ছে
বিশ্লেষকদের মতে, অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের পুনঃসক্রিয়তা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের পাশাপাশি চোরাচালান রোধ, সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক ভাঙা এবং রাজনৈতিক সহিংসতা বন্ধে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করছেন সংশ্লিষ্টরা।