কচুরিপানা কাটার মেশিন উদ্ভাবন করে তিন উদ্যোক্তার বাজিমাত - দৈনিক দেশ কন্ঠ

কচুরিপানা কাটার মেশিন উদ্ভাবন করে তিন উদ্যোক্তার বাজিমাত

প্রকাশকঃ দৈনিক দেশ কন্ঠ
প্রকাশ: সেপ্টেম্বর ২৭, ২০২৬

মনর উদ্দিন মনির : ঘন ও লম্বাকৃতির কচুরিপানা কেটে দু’দিকে সরে পড়ছে, আর কেটে ফাঁকা হওয়া জলপথ দিয়ে অনায়াসে এগিয়ে চলেছে একটি ডিঙ্গি নৌকা। কোনো রূপকথার গল্প নয়, হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার বুল্লা হাওড়ে এখন প্রতিদিনই দেখা মিলছে এমন বাস্তব দৃশ্য। ইউটিউব ভিডিও থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে একটি ডিঙ্গি নৌকার ওপর বিশেষ কৌশলে ইঞ্জিন ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ বসিয়ে কচুরিপানা কাটার এই অভিনব মেশিন উদ্ভাবন করেছেন স্থানীয় তিন উদ্যোক্তা—শামীম, জামাল ও বেলন।
​দীর্ঘ ছয় মাসের নিরলস চেষ্টা ও গবেষণার পর তাদের তৈরি এই মেশিনটি এখন নদী ও জলাশয়ের কচুরিপানা পরিষ্কারে এক বিপ্লব ঘটিয়েছে। এতে যেমন স্থানীয় কৃষকদের ভোগান্তি কমেছে, তেমনই আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন এই তিন উদ্ভাবক। চলতি মৌসুমে মাত্র তিন মাসেই অন্তত ১৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা আয় এবং প্রায় ৯ লাখ টাকা নিট লাভের স্বপ্ন দেখছেন তারা।
উদ্ভাবক ও উদ্যোক্তা শামীম মিয়া জানান, পলি জমে এলাকার নদী-নালা ও খালগুলো নাব্য হারিয়ে ফেলায় প্রচুর শ্যাওলা ও কচুরিপানা জন্মাত। ফলে নৌচলাচল ও কৃষিকাজ পরিচালনা দুষ্কর হয়ে পড়ে। এই সমস্যা থেকে পরিত্রাণের উপায় খুঁজতে খুঁজতেই তারা ইউটিউবে এমন একটি প্রযুক্তির ভিডিও দেখেন এবং কাজ শুরু করেন।
​যন্ত্রটি বাস্তবে রূপ দিতে খরচ হয়েছে প্রায় ৩ লক্ষাধিক টাকা। নৌকা চলাচলের জন্য ৩০ হাজার টাকা মূল্যের ১২ হর্সপাওয়ারের একটি এবং কচুরিপানা কাটার জন্য ৬০ হাজার টাকা মূল্যের ২৪ হর্সপাওয়ারের অপর একটি ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়েছে। এছাড়া ৩টি তিন-পাতার ফ্যান, ৪টি বেয়ারিং ও পিনিয়ামের পেছনে খরচ হয়েছে ২৫ হাজার টাকা। ১ লাখ ৩০ হাজার টাকায় একটি বিশেষ ডিঙ্গি নৌকা তৈরি করা ছাড়াও অ্যাঙ্গেল, ছুরি ও পাতের পেছনে আরও ৫০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে।
শামীম মিয়া আরও জানান, এই মেশিনটি ১০ জন শ্রমিকের পুরো এক ঘণ্টার কাজ একাই করে ফেলতে পারে। প্রতি বিঘা জমির কচুরিপানা কাটতে তারা নিচ্ছেন ২,৫০০ টাকা। প্রতিদিন গড়ে ৬ বিঘা জমির কচুরিপানা কাটা সম্ভব, যা থেকে দৈনিক আয় হয় প্রায় ১৫ হাজার টাকা। তেল ও অন্যান্য পরিচালন বাবদ দিনে খরচ হয় প্রায় ৫ হাজার টাকা, অর্থাৎ দৈনিক নিট লাভ থাকে ১০ হাজার টাকা। ৩ মাসের এই মৌসুমে সব মিলিয়ে ৯ লাখ টাকার বেশি লাভের আশা করছেন তারা।
আরেক উদ্যোক্তা বেলন মিয়া জানান, মেশিনটি চালাতে দৈনিক ২৮ থেকে ৩০ লিটার জ্বালানি তেল লাগে এবং ৩ থেকে ৪ জন শ্রমিক নিয়োজিত থাকেন। আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে তারা এখনো চেইন ও গিয়ারবক্স প্রতিস্থাপন করতে পারেননি; এটি করা সম্ভব হলে কাজের গতি ও লাভ দুটোই দ্বিগুণ হবে।
​তিনি আরও জানান, কাটানো কচুরিপানা ও শ্যাওলা পচে চমৎকার জৈব সার তৈরি করা সম্ভব। নতুন এই মেশিনটি তারা বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি ও ভাড়া দিচ্ছেন। সরকারি বা বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে ভবিষ্যতে আরও উন্নত ও আধুনিক মানের মেশিন তৈরি করতে পারবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
​এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি অধিদপ্তর জানিয়েছে, স্থানীয় তরুণদের এই উদ্ভাবনের কথা তারা অবগত আছেন এবং শিগগিরই সরেজমিনে মেশিনটি পরিদর্শন করা হবে।