
মনর উদ্দিন মনির: মুঘল আমলের স্থাপত্যশৈলীর এক অনন্য ও ঐতিহাসিক নিদর্শন হবিগঞ্জের লাখাই উপজেলার মোড়াকরি (পূর্ব) গ্রামের তিন গম্বুজ শাহী মসজিদ। উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে ছায়া-সুনিবিড় গ্রামীণ পরিবেশে দীর্ঘ ৩৫০ বছর ধরে ঐতিহ্য বহন করে দাঁড়িয়ে আছে প্রত্নতাত্ত্বিক এই স্থাপনাটি। নির্মাণশৈলীর নিপুণতা ও দৃষ্টিনন্দন কারুকার্য এখনও দর্শনার্থীদের নজর কাড়ে। স্থানীয়দের কাছে এটি ‘বাইতুল মুকাদ্দাস মসজিদ’ নামেও পরিচিত।
নথিপত্র ও স্থানীয় ঐতিহাসিক সূত্রের তথ্যমতে, ১৬৭৬ সালে এই ঐতিহ্যবাহী মসজিদটি প্রতিষ্ঠিত হয়। পাথুরে শিলালিপির অভাব থাকলেও ইতিহাসবিদদের মতে, এটি সুলতানি বা প্রাক-মুঘল আমলের শেষভাগে নির্মিত। এই অঞ্চলে প্রাচীন নদীপথ সচল থাকায় ধর্ম প্রচারক ও স্থানীয় প্রভাবশালী মুসলিমদের উদ্যোগে মসজিদটি গড়ে ওঠে। স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, তৎকালীন প্রভাবশালী জমিদার শাহ মাহমুদ এই ঐতিহাসিক মসজিদটি নির্মাণ করেন।
পাতলা মুঘল ইট এবং চুন-সুরকির মজবুত গাঁথুনিতে নির্মিত এই মসজিদটি প্রায় ৮ থেকে ১০ শতাংশ জমির ওপর অবস্থিত। এতে রয়েছে—৩টি দৃষ্টিনন্দন গম্বুজ ও একাধিক ছোট মিনার, ৫টি প্রবেশদ্বার এবং ১০/১২ টি পিলারের ওপর নির্মিত ছাদ,প্রায় ১৫ ফুট উচ্চতার মূল প্রার্থনা কক্ষ, যেখানে একসঙ্গে শতাধিক মুসল্লি সালাত আদায় করতে পারেন, মসজিদ প্রাঙ্গণে রয়েছে একটি বিশাল ও প্রাচীন পুকুর। এই পুকুরটির পুরোনো সিঁড়ি সংস্কার করে নতুন সিঁড়ির সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে, যা এর নন্দনতত্ত্ব রক্ষায় ভূমিকা রাখছে।
দীর্ঘদিনের প্রাচীন এই স্থাপনাটি বর্তমানে চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। সামান্য বৃষ্টি হলেই ছাদ চুইয়ে ভেতরে পানি পড়ে ইবাদতের পরিবেশ নষ্ট হয়। এছাড়া দেয়াল ও ছাদে একাধিক ফাটল দেখা দিয়েছে, যা যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে। এছাড়াও এ মসজিদটির বিকল্প হিসেবে এর পাশেই আরেকটি নতুন মসজিদ নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছে। নতুন মসজিদ নির্মাণ হলে ওই পূরাতন ঐতিহাসিক মসজিদটি ভেঙ্গে ফেলার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
মসজিদের বর্তমান ইমাম মাওলানা মোফাচ্ছির ও স্থানীয় মুসল্লিরা জানান, এটি কেবল ইবাদতখানা নয়, পুরো অঞ্চলের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। বর্তমানে এর পাশেই একটি নতুন মসজিদ নির্মিত হচ্ছে, তাই প্রাচীন এ ভবনটি ভেঙে ফেলার কোনো শঙ্কা নেই। তবে প্রয়োজনীয় সরকারি অনুদান ও প্রত্নতাত্ত্বিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এটি দিনে দিনে ধ্বংসের মুখে পড়ছে।
স্থানীয়দের নিজস্ব অর্থায়নে সীমিত পরিসরে সংস্কারকাজ চালানো হলেও প্রাচীন এই ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা। প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব বিবেচনা করে দ্রুত সরকারি উদ্যোগে মসজিদটি সংস্কার ও সংরক্ষণের আকুল দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী ও ইতিহাসপ্রেমীরা। তাদের প্রত্যাশা, সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ করা গেলে মোড়াকরি গ্রামের এই তিন গম্বুজ শাহী মসজিদটি এই অঞ্চলের অন্যতম প্রধান ঐতিহাসিক পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে।
এবিষয়ে লাখাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তারেক হাসান বলেন, বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখে প্রয়েজনীয় ব্যাবস্থা গ্রহণ করা হবে।